জাহাজ নির্মাণশিল্পে ক্যারিয়ার গড়ুন

5350 2017-07-14 Education & Training
Naima Yasmin

Naima Yasmin
Contributor

রোমাঞ্চকর কাজ ও জীবনযাপনের প্রতি তরুণদের মোহ সহজাত। নগরের যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে জীবনের অন্য রকম ছোঁয়া পেতে অনেকেই পাড়ি জমান সাগরে, কেউ কেউ জাহাজে জাহাজে ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন। রোমাঞ্চকর এমন কিছুই যদি পেশা বা ক্যারিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তো কথাই নেই। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি হয়েছে জাহাজশিল্পকে ঘিরে। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টির মতো জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান তো বিদেশেও আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ রফতানি করছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে বাজার বাড়ায় দেশের জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত দক্ষ জনবল খুঁজতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে দিন দিন কাজের সুযোগ বাড়ছে। যেটি কাজে লাগিয়ে আপনিও একটি সুন্দর ক্যারিয়ার বা কর্মজীবন গড়ে তুলতে পারেন।

প্রসপেক্টসঃ

জাহাজ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অন্তত ১০টি শিপইয়ার্ড রফতানি উপযোগী জাহাজ নির্মাণ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে। সরকারি ডকইয়ার্ডের পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে শতাধিক ছোট ও মাঝারি ধরনের ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। কাজেই দিন দিন এ খাতে কাজের সুযোগ বাড়ছে। এ ছাড়া বিদেশেও এ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, কাতার, সৌদি আরবসহ নৌপথে আমদানি-রফতানির সঙ্গে যুক্ত অনেক দেশেই চাকরি সুযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে অভিজ্ঞ কর্মীদের ভালো বেতন দেয়া হয়। দেশের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেতন পাওয়া যায় বিদেশে। দেশে এ খাতে দু-তিন বছর কাজ করলেই তার সামনে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ উন্মুক্ত হয়ে যায়। কাজেই এ খাতে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন।

যাদের কাজের সুযোগ আছেঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের অন্তর্ভুক্ত জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ খাতের কাজে শুধু দেশেই সুযোগ নয়, বিদেশেও রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে কাজের সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে জাহাজ রফতানিকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আহমেদ জায়িফ বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কাজগুলো মূলত টেকনিক্যাল বিষয়। এ কারণে প্রকৌশল বিষয়ে পড়া লোকদের এখানে কাজের ভালো সুযোগ রয়েছে। জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে মূলত নেভাল আর্কিটেক্ট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বেশি লাগে। ডিপ্লোমা ও গ্র্যাজুয়েট-উভয় ধরনের প্রকৌশলীরই দরকার পড়ে। তবে দেশে বর্তমান অবস্থায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের কাজের সুযোগ তুলনামূলক বেশি রয়েছে। জাহাজ শিল্পে শিপ বিল্ডিং প্রকৌশলীর পাশাপাশি সহকারী প্রকৌশলী, সুপারভাইজার ও মান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করার সুযোগ আছে।

পেশার দায়দায়িত্বঃ

জাহাজ নির্মাণের কাজকে সাত ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন, প্ল্যানিং, ওয়ার্কপ্রিয়র টু কিল লায়িং শিপ ইরেকশন, লঞ্চিং, ফাইনাল আউটফিটিং ও সি-ট্রায়ার। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেরিন টেকনোলজির শিপ বিল্ডিংয়ের প্রশিক্ষক হারুনুর রশিদ এক সাক্ষাৎকারে জানান, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী একজন নেভাল আর্কিটেক্ট জাহাজের ডিজাইন তৈরি করেন। পুরো জাহাজের ডিজাইনকে আবার কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়। এরপর শিপ বিল্ডিং প্রকৌশলী ডিজাইন অনুযায়ী জাহাজের ওয়েলডিং, ফিটারিং, প্রিন্টিং ও গুণগত যন্ত্রাংশের ব্যবহার নিশ্চিত করা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। পুরো কাজটি করতে হয় নিখুঁত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কারণ, গ্রাহকেরা আন্তর্জাতিক জাহাজ নির্মাণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে গুণগতমান নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। সেজন্য জাহাজটিতে কী ধরনের মালামাল বহন হবে, কোনো নৌপথে চলবে ও কোনো মৌসুমে চলবে ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখেই জাহাজ তৈরি করতে হয়।

যোগ্যতাঃ

জাহাজ শিল্পে সাধারণত সব চাকরি প্রত্যাশীকে ইংরেজি, গণিত ও মানসিক দক্ষতার ওপর একটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিতে হয়। সেখানে থেকে প্রত্যাশীত নম্বর অর্জনকারীদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় চাকরিপ্রত্যাশী জাহাজ নির্মাণসংশ্লিষ্ট যে বিষয়ে কাজ করবেন, সেই বিষয়ে তার দক্ষতা ভালোভাবে পরখ করে দেখা হয়। লোক নিয়োগের জন্য বিভিন্ন পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন hotjobsbd.com  পোর্টালগুলোতে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়।

রেজাল্ট নয় দক্ষতায় অগ্রাধিকারঃ

এসব ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনে অর্জিত ফল (একাডেমিক রেজাল্ট) কতটা গুরুত্ব বহন করে, এ বিষয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তা আহমেদ জায়িফ বলেন, একাডেমিক রেজাল্টের চেয়ে বিষয়গত দক্ষতার (সাবজেক্টেটিভ স্কিল) বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। লোক নিয়োগ করতে গিয়ে দেখা গেছে, খুবই ভালো ফল অর্জন করেছেন, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তেমন দক্ষ নন। আবার ভালো একাডেমিক ফল না করে মোটামুটি ফল নিয়ে ভালো করেছেন। তাই প্রার্থীকে অর্জিত ফলের সঙ্গে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

কাজের ক্ষেত্রঃ

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জাহাজ নির্মাণ-প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজও তৈরি করছে। তাছাড়া ইতিমধ্যে আমাদের দেশের জনবল দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছে। ওইসব দেশে আমাদের দেশের লোকজনের চাহিদাও রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক কেমব্রিজ মেরিটাইম কলেজের (সিএমসি) পরিচালক খোরশেদ আলম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মালামাল নৌপথে পরিবহন করা হয়। সে অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও জাপানসহ অনেক দেশই জাহাজ শিল্পকে কাজে লাগিয়ে তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। আমাদের দেশেও এ শিল্পকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো সম্ভব।

বেতন ও সুযোগ-সুবিধাঃ

সদ্য পাস করা ডিপ্লোমাধারীরা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে চাকরির শুরুতে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। আর গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারীরা মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় চাকরি শুরু করেন। এ ছাড়া কোম্পানির নিয়মানুযায়ী তারা অন্যান্য সুবিধা পান। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছরই কাজের ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট ও ইনসেনটিভ দেয়। গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড সুবিধাও রয়েছে। অভিজ্ঞ প্রার্থীরা যোগ্যতা অনুযায়ী আরও বেশি বেতন পান।

কোথায় পড়বেনঃ

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সরকারিভাবে পরিচালিত নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিপ বিল্ডিং টেকনোলজি ও দুই বছর মেয়াদি শিপ বিল্ডিং, শিপ ফেব্রিকেশন ও শিপ বিল্ডিং অ্যান্ড মেকানিক্যাল ড্রাফটসম্যানশিপ কোর্স চালু রয়েছে। স্নাতক পড়ার সুযোগ রয়েছে ম্যারিটাইম ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম ফিশারিজ ইউনিভার্সিটিতে। এছাড়াও কিছু বেসরকারি ইন্সটিটিউটে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রশিক্ষণের বিষয়ঃ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণসংক্রান্ত বিভিন্ন মেয়াদি ডিপ্লোমা ও প্রশিক্ষণ কোর্সে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা দুটোতেই জোর দেয়া হয়। এখানে জেনারেল শিপ নলেজ, বেসিক ইলেকট্রিসিটি, শিপ বিল্ডিং ড্রয়িং, মেকানিক্যাল ড্রয়িং, নেভাল আর্কিটেকচার, বেসিক ওয়েল্ডিং, শিপইয়ার্ড প্র্যাকটিস, বেসিক ওয়ার্কশপ প্র্যাকটিস, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, বেসিক ইলেকট্রুনিক, ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স, শিল্প ব্যবস্থাপনা, ইংরেজি, পরিবেশ বিজ্ঞান, নিরাপত্তা প্রভৃতি সম্পর্কে পড়ানো হয়। ব্যবহারিক জ্ঞানের জন্য বিভিন্ন জাহাজ নির্মাণ কারখানায় কাজ করতে হয়।

লেখকঃ মোহাম্মদ আতাউর রহমান  

ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি ও ক্যারিয়ার বিষয়ক আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিনঃ fb.com/engrjobs.bd 

  

Leave you comments here

  
Similar Post for You

ইঞ্জিনিয়ার /আর্কিটেক্ট সম্পর্কিত চাকরির তথ্য পেতে নিচের পেজে লাইক দিন

বিভাগসমুহ



Copyright © 2012-2017, Hotjobs. Developed by YOUTHFIREIT.